মেডিক্যাল ডিভাইস সবচেয়ে বেশি কারা ব্যবহার করেন?

উত্তরটা বেশ সহজ- ডাক্তারেরা।

 

কিন্তু এই মেডিক্যাল ডিভাইস তৈরি করেন কারা?

এটাও সহজ প্রশ্ন, ইঞ্জিনিয়াররা।

 

এখন কোন মেডিক্যাল ডিভাইস তৈরি করার সময় ইঞ্জিনিয়াররা ডাক্তারদের কাছ থেকে একমাত্র যে সাহায্য পান, তা হল যন্ত্রটির কাজ কি- সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা। যন্ত্রটি কি কাজ করবে সেটি ডাক্তার বলতে পারবেন, কিন্তু সেটা কিভাবে কাজ করবে সেটা ইঞ্জিনিয়ারকেই ঠিক করতে হবে। আর ঠিক এখানে যে ব্যাপারটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তা হল- ইঞ্জিনিয়ারদের হিউম্যান বডি সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা। ডাক্তার ডিভাইসটিকে দিয়ে ঠিক যেরকম কাজ করাতে চাইছেন ইঞ্জিনিয়ার জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না- কিভাবে আগালে ডিভাইসটি সেই কাজটা করতে পারবে?

 

মূলত এই জায়গা থেকেই আধুনিক দিনের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর সৃষ্টি।

 

শেষ ১০ বছরে আন্ডারগ্র্যাড এজুকেশনের নতুন সাবজেক্টগুলোর মধ্যে "মোস্ট টকড অ্যাবাউট" সাবজেক্টগুলির একটি বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। ইম্পরট্যান্স বা সাব্জেক্টিভিটির স্ট্রেংথের কারণে সম্পূর্ণ নতুন এই বিষয়টার  জনপ্রিয়তার গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী।

 

বিএমই কিঃ এই প্রশ্নটার উত্তর অনেকভাবে দেওয়া যায়। এক বাক্যে বলতে গেলে সেটা হচ্ছে, "Application of Engineering knowledge into living body"। মানে, সামগ্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানগুলোকে জীবন্ত সত্ত্বায় প্রয়োগ করা। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের মূল কাজ এটাই। তবে এখানে প্রধানত Human Being নিয়েই বেশি কথাবার্তা হয়।

 

বিএমই তে কি পড়ানো হয়ঃ মূলত অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টগুলোর জ্ঞানকে মডিফাই করে এখানে পড়ানো হয়। যেমন ধরো, সিভিল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ যেমন বলবিদ্যা (Mechanics) পড়ানো হয়, এখানে পড়ানো হয় Biomechanics । ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ানো হয় Electricity, আমাদের পড়ানো হয় Bioelectricity। ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এ Materials বা পদার্থের ধর্ম নিয়ে পড়ানো হয়, এখানে পড়ানো হয় Biomaterials। তবে মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের মত এনাটমি আর ফিজিওলজিও পড়ানো হয় (যদিও ওদের মত সব টপিকে সমান গুরুত্ব না দিয়ে বিএমই এর বিশেষ প্রয়োজনীয় টপিকগুলোতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়)। আর নরমাল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ তো আছেই। সাথে আছে হালকা প্রোগ্রামিং ও যা কিনা Bioinformatics এ বেশ কাজে লাগে।

 

সুতরাং বুঝতেই পারলে, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং পুরাতন বা প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ড থেকে একটু আলাদা। এটাকে Interdisciplinary field হিসেবেও ধরা যায় কারণ এখানে একই সাথে বেশ কয়েকটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডের সমন্বয় ঘটেছে।

 

এসবের পাশাপাশি Biomedical Instrumentation, Biomedical Sensor, BioMEMS, Lab-On-A-Chip Device, Medical Imaging, Tissue Engineering and Regenarative Medicine, Neural Engineering, Rehabilitation Engineering, Healthcare Management, Microfluidics এই বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয় এখানে।

 

বিএমই কাদের নেওয়া উচিতঃ অ্যাকচুয়ালি এটা সবাই পড়তে পারে। অনেকে আছে যারা বায়োলজি পছন্দ করে না। তাদের উদ্দেশ্যে,  এখানে বায়োলজি বলে আহামরি কিছু নেই, যা আছে তা হল শুধু এনাটমি, ফিজিওলজি বায়োকেমিস্ট্রি, তাও মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের মত অতটা ডিটেইলস নেই, কেবলমাত্র যে টপিকগুলো জানা দরকার সেটাই পড়ানো হয়। অবশ্য বুয়েটে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টা পেতে হলে ইন্টারমিডিয়েটে লেভেলে বায়োলজিতে অন্তত GPA 4.00 থাকতে হয়।

 

বাংলাদেশে বর্তমানে যেসকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি পড়ানো হয় তাদের মধ্যে আছে: BUET, KUET, MIST, JUST (Jessore University of Science & Technology), Islamic University (Kushtia) ও সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়। উল্লেখ্য যে আগামী ২০১৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রথম বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার গ্রাজুয়েটরা তাদের স্নাতক সম্পন্ন করবেন।

 

বিএমই তে পরে ভবিষ্যতে কি করবঃ এই প্রশ্নটা যে কারো মাথায় এই আসা স্বাভাবিক (অভিজ্ঞতা বলে, সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন এখানেই আসে)। যাই হোক, ব্যাপারটাকে আমরা দেশীয় ক্ষেত্র ও বিদেশের পারস্পেক্টিভ- এই দুভাবে চিন্তা করতে পারি।

 

দেশীয় দিক চিন্তা করলে, দেশের প্রতিটা সরকারি মেডিক্যাল কলেজে একজন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এর পোস্ট আছে। অথচ দেশে এখন পর্যন্ত একজনও গ্র্যাজুয়েটেড বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার না থাকায় অনেকক্ষেত্রে সেই পোস্টটা ফাঁকা রেখেই হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একজন গ্র্যাজুয়েটেড বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তাই দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে চাকরির সুযোগ। এছাড়াও অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগোনস্টিক সেন্টারে কাজের ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে কিনা স্যালারিটা আরও বেশি।

 

দেশের আরেকটা বড় ফিল্ড হলো ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর। ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে যারা রিসার্চ করেন, তাদের কাজের একটা বিশাল অংশ জুড়ে থাকে ড্রাগ ডেলিভারি (শরীরের ভিতরে ড্রাগ বা মেডিসিন কিভাবে যাচ্ছে এবং তা হিউম্যান বডির দ্বারা কিভাবে absorb হচ্ছে)। আর বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদেরও পড়াশুনা বা গবেষণার একটা বড় অংশ কাটে ড্রাগ ডেলিভারি নিয়ে কাজ করে। তাই দেশীয় ঔষধ শিল্পে বেশ একটা বড় জায়গা হতে পারে একজন বিএমই গ্র্যাজুয়েটের। এছাড়া সরকার কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন রিসার্চ প্রোগ্রামেও রিসার্চার হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সুযোগ রয়েছে আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার।

 

এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান দেশে মেডিক্যাল ডিভাইস তৈরি বা আমদানি করে সেখানেও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ধরো, Siemens, Hitachi Ltd, ABC Ltd, Transmed Ltd, Medtronic Ltd. ইতাদি- যারা কিনা বায়োমেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি দিতে মুখিয়ে আছে।

 

দেশে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সুযোগটা হচ্ছে Entrepreneur বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ। যেহেতু এখনো দেশে মেডিক্যাল ডিভাইস তৈরির চেয়ে আমদানিই বেশি হচ্ছে- সেক্ষেত্রে দেশে যদি শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে তা দেশের প্রেক্ষাপটে Pioneer হিসেবেই গণ্য হবে এবং দেশও আমদানি নির্ভরতা থেকে বাঁচবে।

 

এখন আসা যাক বিদেশের পারস্পেক্টিভে। এখানে প্রথমে আসবে রিসার্চ ফিল্ড কেমন? সত্যি বলতে বায়োমেডিক্যালের মত রিসার্চ ফিল্ড খুব কম বিষয়েরই আছে। তাই রিসার্চের জন্য ফান্ডিং বা প্রফেসর খুঁজে পাওয়া অন্যান্য বিষয়ের মত দুঃসাধ্য নয়। স্পেসিফিক্যালি BME,BUET এর সাথে বিভিন্ন দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছে বা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যার ফলে উচ্চশিক্ষায় ও গবেষণায় এই সেক্টর থেকে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

আর বিদেশে চাকরির বাজার? সেটা লার্জেস্ট গ্রোয়িং ফিল্ড হিসেবে ইতিমধ্যে সবার নজর কেড়েছে। একটু ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করলেই এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এই সেক্টরে গ্রোথ রেট প্রায় ২৩ শতাংশ। আর স্যালারিটাও বেশ লোভনীয়।

 

অনেকটা গল্প করার মত করেই বলে ফেলা হল অনেক কথা। তবে এর মধ্যেই যা বলার বলে দেয়া হয়েছে। এখানে খুব কঠিন কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং টার্ম ইউজ করে তোমাদের লিউর করা যেত, কিন্তু করব না, এমনভাবে লেখা হয়েছে যেন সবাই সহজে বুঝতে পারে।

 

মোটকথা এ সময়ের চাহিদা পূরণের জন্যই বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এসেছে। তাই বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তোমাকে পৃথিবীর স্মার্টেস্ট ও আপ-টু-ডেট মানুষদের একজনে পরিণত করবে।

 

তোমাদের প্রতি শুভকামনা রইল। দেখা হবে।

 

-Wahidur Rahman Rafsan

-Farhan Muhib

-Biswarup Goswami

-Meemnur Rashid

 

Department of Biomedical Engineering, BUET

Batch ‘15