১.

শুরুর গল্পটা আর দশটা বুয়েটিয়ানের মত ছিল তা অবশ্যই বলতে পারিনা। নতুন সাবজেক্ট, ভবিষ্যৎ কি, চার বছর পর আমাদের কি হবে- ব্যাপারগুলা ছিল অনেকটাই এরকম। অনেককেই এখানে আসতে হয়েছে পারিবারিক সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে বেশ কিছুটা সংগ্রাম করেই, আবার কেউবা কিছু একটা পড়তে হবে বলে আসা। ব্যাপারটা আর যাই হোক না কেন- দিনের শেষে আর দশটা বুয়েটিয়ানের মধ্যে মিশে যাওয়াটাই ছিল বড় একটা চ্যালেঞ্জ। জানিনা, আমরা কতটুকু পেরেছি, তবে মিশে যাওয়ার জন্য যতটুকু চেষ্টা করা দরকার তার ঘাটতি ছিল না কখনোই।

 

২.

২৭ ফেব্রুয়ারি, সকাল ৮ টা। ইসিই বিল্ডিং , 10th ফ্লোর ।

নতুন ক্লাসরুম, নতুন চেয়ার-টেবিল, আর ৩০টা নতুন মুখ। একে একে সব কটা ক্লাস শুরু, একটা নতুন দিনের শুরু, একটা নতুন ডিপার্টমেন্টের শুরু।

সেই টার্মে একটাই ডিপার্টমেন্টাল কোর্স ছিলো। ক্লাস নিতেন ড. তারিক আরাফাত স্যার। স্যার সম্পর্কে আলাদা করে না বললেই নয়। একজন স্যার যে মানুষ হিসেবে কতটা ভালো হতে পারেন, নিশ্চিতভাবেই স্যার ছিলেন তার উদাহরণ।

রিসিপশন না পাবার জন্যে সবারই ভেতরে ভেতরে একটা খারাপলাগা ছিলো। যদিও রিসিপশন পাইনি বলাটা ভুল হয়, কারণ বরণ করে নিতে ক্লাসে এসেছিলেন বুয়েটের আয়রন লেডি নামে খ্যাত তৎকালীন ভিসি খালেদা ইকরাম ম্যাডাম। ম্যাডাম এসে আমাদের সবার কাছে ডিপার্টমেন্টের সমস্যাগুলো জানতে চেয়েছিলেন। নতুন বলে একটা ডাস্টবিনের অভাব ছিল তখন। একজন আবার ধুম করে ম্যাডামের কাছে ডাস্টবিনই চেয়ে বসলো। এ ঘটনার পর ম্যাডাম এর সেই হাসি কোনোদিনই ভোলার নয় ।

৩.

সকাল সকাল ফোনেটিক্স, অরগানিক কেমিস্ট্রির পেইজ এর পর পেইজ উল্টানো সাবস্টিটিউশন-এলিমিনেশন রিঅ্যাকশন, ম্যাথ ক্লাসে ম্যাডাম এর লিমিট নির্ণয়ের গতির সাথে পেরে না উঠে আরামের ঘুম, চোথার সন্ধানে পলাশী অভিযান, সৃজনশীল বায়োমেডিকেল প্রশ্ন আর সেশনালের ল্যাব রিপোর্টের প্যাচে পরে কবে যে টিপিক্যাল বুয়েটিয়ান হয়ে গেছে সবাই- কেউই ঠিক ঠাওর করতে পারিনি। ক্যাফে, হাফ ওয়াল, বুয়েট মাঠ, আর্কিচিপা- এগুলোর মিনিং একটু একটু বুঝতে শেখা; আর এরই মাঝে মায়ার বাঁধনটা আরও একটু শক্ত হয়ে ওঠা।

সময় থেমে থাকে না। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলে যায়। মিড ব্রেকের আগেই একটা সুখবর এলো। ন্যাশনাল হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন হলো বায়োমেডিকেল এর Buet_Exon। সেই সময়ে সবার আনন্দটা ছিল দেখার মত।

পিএল এর শুরুতে ইফতার পার্টি ছিলো। সবাই মিলে খেতে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া ছিলো অহরহ।

৪.

টার্ম ফাইনাল হলো। নতুন টার্ম ১-২ শুরু হলো। নতুন টার্মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিলো অ্যানাটমি ক্লাস। ডিএমসির অ্যানাটমি বিভাগের হেড শামীম আরা ম্যাডাম ক্লাস নিতেন। অদ্ভুত, অসাধারণ একেকটা ক্লাস। ম্যাডামের সাথেই ডিএমসিতে ল্যাব দেখতে যাওয়া হয়েছিলো। শোয়ানো একটা লাশ, ঘরজুড়ে কার্বলিক এসিড আর ফরমালিনের গন্ধ; আর তারই মাঝে কোনটা ফ্রন্টাল লোব আর কোনটা ইসোফ্যাগাস- সেসবের তালগোল পাকিয়ে ফেলা।

৫.

কিন্তু প্রথম ব্যাচ হিসেবে অতৃপ্তির চেয়ে তৃপ্তির ভান্ডারটাই মনে হয় সবার অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সব স্যার-ম্যাডামদের কাছে আলাদা একটা ভালবাসার জায়গা আছে। নতুন নতুন কোর্সগুলোতে অনেক রোমাঞ্চকর ব্যাপার আছে। সিনিয়র কেউ না থাকার আক্ষেপ হয়তো আছে কিন্তু নিজেরাই প্রথম সিনিয়র হবার গৌরব আছে । ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্মৃতিগুলা জমা করলে হয়তো বিশাল পাহাড় হয়ে যাবে কিন্তু সেইসব স্মৃতিগুলোই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কারণ যার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি তার সবই হবে প্রথম, সবই একদিন হবে ইতিহাস।

নিজেদের ডিপার্টমেন্ট নিজেদের ইচ্ছামতন সাজানোর অধিকার- পর্দার রঙ থেকে শুরু করে লাইব্রেরির ফার্নিচার, গার্লস কমনরুমের কার্পেট বা সোফা সবকিছুই যে নিজেদেরই পছন্দ করা। মনে আছে, যেদিন প্রথম টি-মেকারটা এল, সেদিনই সবাই মিলে পড়ন্ত বিকেলে একসাথে চা বানিয়ে খাওয়া; নতুন ল্যাবগুলোর জন্য যেসব ইকুইপমেন্ট আনা হচ্ছে, সেগুলো সবাই মিলে দেখতে যাওয়া- এগুলার মাঝেও অন্যরকম এক আনন্দ আছে।

৬.

একদিকে সাদিকুর ইলেক্ট্রিকাল সার্কিট তো, অপরদিকে কমপ্লেক্স ভ্যারিয়েবলের ক্লাস। আবার এইদিকে ভেক্টর ক্যালকুলাসের জটিল-গরল পড়া তো, অন্যদিকে অ্যানাটমির হার্ট-লাংসের মত অখাদ্য জিনিস- সমন্বয়টা বেশ অদ্ভুত না? বেশ কষ্ট হলেও, এগুলো নিয়েই আনন্দে আছি সবাই। বেড়ে চলছে মায়া- ক্যাম্পাসের প্রতি, নিজেদের সাজানো ডিপার্টমেন্টের প্রতি।

একটা বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এরপর ১০ তলায় আরও ৩০ জোড়া পায়ের পদচারণা বেড়ে যাবে। এভাবে ৩০ থেকে ৬০, ৬০ থেকে ৯০, ৯০ থেকে ১২০- এভাবেই এগিয়ে যাবে। আবার, কখনো এই ডিপার্টমেন্টের সিলভার, রুবী বা গোল্ডেন জুবিলী তে সর্বপ্রথম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী হয়ে দুটো কথা বলতে পারবো!! এই আনন্দটাই বা কম কিসের।

স্বপ্ন আছে। ৩০ টি প্রাণের মিলন আছে, বন্ধন আছে, একতা আছে। নতুন পথে নতুন করে এগিয়ে যাবার প্রত্যয় আছে।

আর জানি এভাবেই এগিয়ে যাবে সবাই, এগিয়ে যাবে একটি নতুন ডিপার্টমেন্ট, লেখা হবে বুয়েট ইতিহাসের নতুন কোন অধ্যায়, খুলবে সম্ভাবনার নতুন এক দিগন্ত। ভালো থাকুক বুয়েট, ভালো থাকুক বিএমই।